বার্লিনে বাংলাদেশের রামপাল ও বিকল্প জ্বালানী বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন সুন্দরবন বাঁচাতে বার্লিন ঘোষণা

বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বাগেরহাটের রামপালে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কার্যক্রম চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সিডর, আইলার মত প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দুর্যোগ মোকাবেলায় সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলের একমাত্র রক্ষাকবচ এবং সেই সাথে লাখো বনজীবি  মানুষের জীবিকার উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখে। রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে সুন্দরবনের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও জীবিকা সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। তাই শুধু দেশেই নয় বরং ইউরোপসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা  বাংলাদেশী পেশাজীবি, ছাত্র-শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, পরিবেশবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন এবং রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র না করার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে নানাভাবে উদ্যোগী হয়েছেন। বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্বলিত বিশ্লেষণের পাশাপাশি সভা-সমাবেশের মাধ্যমে এই তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি দেশে-বিদেশে দিন দিন আরো জোরালো হচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানীর নেতিবাচক দিকগুলো বিবেচনা করে ইতোমধ্যে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ নির্বিশেষে  জীবাশ্ম জ্বালানী নির্ভর বিদ্যুৎ  উৎপাদন পরিকল্পনা থেকে সরে এসে পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী নবায়ণযোগ্য জ্বালানীকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করছে। রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাঁচাবার দাবী ও বিকল্প জ্বালানী বিষয়ক সম্ভাব্য নীতি খুঁজে দেখার দাবী করেছেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ইউরোপীয় নেটওয়ার্ক।

গত ১৯ ও ২০ আগষ্ট বার্লিন শহরের গনতান্ত্রিক ও মানবধিকার কেন্দ্রে আয়োজিত দুদিন ব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ও বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনের শেষ দিন  রামপাল  বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করে সুন্দরবন বাঁচাতে বার্লিন ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়।

বার্লিনে রামপাল বিষয়ক দুইদিন ব্যাপী সম্মেলনে বাংলাদেশে রামপাল প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব ও বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানীর সম্ভ্যবতা নিয়ে চারটি সেশনে সর্বমোট আটটি প্রবন্ধ পাঠ করেন আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞগন। এছাড়া সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী জার্মানিরসহ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, হল্যান্ড, নরওয়ে ও জার্মানিতে বসবাসরত ছাত্র ছাত্রী গবেষক ও পেশাজিবীরা এই বিষয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করেন।

সম্মেলনে বক্তারা  সুন্দরবনকে শুধু বাংলাদেশের নয়, তা বিশ্ব জলবৈচিত্র্যর সম্পদ বলে অভিহিত করেন এবং তা রক্ষা করতে সবাইকে সোচ্চার হবার আহবান জানান। বিশ্ব জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন অধ্যাপক ভীলফ্রেড এন্ডলিশার। বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানীর বিশাল সুযোগ আছে বলে মনে করেন অধ্যাপক হার্টমুট বেরভোল্ফ। আনু মোহম্মদ বাংলাদেশের তৈল গ্যাস নিয়ে বিগত সময় গুলিতে বিভিন্ন সরকারের গাফিলতির কারণে দেশীয় জ্বালানী ও পরিবেশ সম্পদের ক্ষতির বর্ণনা দেন। বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাহবুব সুমন, বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানীর প্রয়োগ ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন বার্লিনে রামপাল ও বিকল্প জ্বালানী বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বার্লিন  ঘোষণাপত্রের সাথে পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র বিষয়ক সংগঠন গ্রীণপিস, ফ্রেন্ডস অব দ্যা আর্থ. ৩৫০.অর্গ, ওয়াল্ড ওয়াইল্ড ফাউন্ডেশন, উইমেন এনগেজ ফর দ্য কমন ফিউচার, ব্যাঙ্কট্রাকসহ সারা বিশ্বের প্রায় একশত সংগঠন সংহতি প্রকাশ করেছেন।

বার্লিন ঘোষণাপত্রে সুন্দরবনের অনতিদূরে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের কারণে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভে সম্ভাব্য ক্ষতি, ভারত ও চীন বা এশিয়া ও ইউরোপের অনান্য দেশের উদাহরণ গ্রহণ করে পরিবেশ বান্ধব জ্বালানীর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পণা গ্রহণসহ বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক প্রকল্পসমূহ বন্ধের আহবান জানানো হয়েছে।