বাংলাদেশ ভবন : ‘ভাইয়ের সঙ্গে ভাইকে সে যে করেছে আপন’

পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল ও বহু সংস্কৃতির দেশ ভারতের সঙ্গে আমাদের এখনকার সম্পর্ক তাৎপর্যময়। বলা যেতে পারে, আমাদের অগ্রগতি ও চেতনার হালনাগাদ শৌকর্য বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার অংশ হিসেবেই এই সম্পর্ক। অবশ্যই বলতে হবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে জয়লাভ করছে। বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসে ভারত প্রধানতম সহায়ক শক্তি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নজাল যে জায়গাগুলো থেকে গাঁথা হয় তার এক নিবিড় আশ্রয়স্থল ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি সড়কে, পুরনো ভবনে, পুরোনো মানুষদের মাঝে বাংলাদেশ গড়ে আছে অনন্য এক প্রতিবেশ। সেখানকার বিদগ্ধজনদের কাছে বাংলার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিস্ময় হয়ে আছেন। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের গর্ব উপমহাদেশের মহান নেতা, বাংলাদেশের জাতির জনক এর শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে জীবনের অনেক অধ্যায় কেটেছ পশ্চিমবঙ্গে। একজন রাজনীতিক হিসেবে তার মনোজগ‍ৎ গড়ে ওঠার পেছনে পশ্চিমবঙ্গের অবদান অনেক। কলকাতা পার্ক সার্কাস এলাকার গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সড়ক। ওই সড়কেই বাংলাদেশের উপ হাইকমিশন অফিস। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ঐতিহাসিক এক ক্ষেত্র। দেশের বাইরে ওই ভবনেই প্রথম উত্তোলিত হয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। যেকোনো বাংলাদেশিই তার শেকড়ের পরিচয় পেয়ে যান ঠিক ওই জায়গাটিতে দাঁড়ালে। স্বাধীন বাংলা সরকারের অস্থায়ী কার্যালয়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শুরু করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বহু স্মৃতিক্ষেত্র রয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গে। কিছু কিছু কালের গর্ভে অস্তিত্ব হারালেও কোনো কোনো স্মৃতি এখনও জীবন্ত। সেই স্মৃতিক্ষেত্রের সঙ্গে বাংলাদেশ এবার যুক্ত হয়েছে তার সতেজ, উন্নত ও সম্ভাবনাময় অস্তিত্ব নিয়ে।

শান্তিনিকেতন এ উপমহাদেশের জ্ঞান, শিল্প ও মুক্তিসাধণার এক তীর্থকেন্দ্র। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে বসেই মানবধর্মের গভীর সত্যের সন্ধান করেছেন। সাহিত্য রসিক ও সৃষ্টিসাধকদের কাছে শান্তিনিকেতন হয়ে আছে এক অন্যরকম ক্ষেত্র যেখানকার ভূমি স্পর্শ করলেই যেন জীবন ও শিল্পের সম্পর্ক আবিস্কার করা যায়। এখানে যেন উন্মুক্ত বাঙালির জীবনের বিশালতা। বিশ্ববাংলার এক গভীর সান্নিধ্য এই শাান্তিনিকেতন।

রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন ‘ আমাদের শান্তিনিকেতন, সে যে সব হতে আপন / মোদের প্রাণের সঙ্গে প্রাণে সে যে মিলিয়েছে একতানে / মোদের ভাইয়ের সঙ্গে ভাইকে সে যে করেছে আপন, সে যে শান্তিনিকেতন..৷’  শান্তি সম্পর্ক আর সৌহার্দ্যের এই প্রাণকেন্দ্রেই ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ স্থাপন করেন বিশ্বভারতী। বাঙালির গর্বের দুই ব্যক্তিত্ব নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন, অস্কারজয়ী চিলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় এখানে পড়েছেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও এখানে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে শান্তি নিকেতন কিংবা বিশ্বভারতী শুধু শিক্ষা বা সাধণের ক্ষেত্রই নয়, বাঙালির রুচি ও সংস্কৃতির অনন্য ক্ষেত্রও হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথকে যদি বাঙালির জীবন নদীর প্রথম ও প্রধান প্রবাহ ধরা হয়, তাহলে বিশ্বভারতীকে ধরতে হবে তার মোহনা।  সেখানে এবার আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতি আমাদেরকে অনেক বেশি গর্বিত করেছে। সবচেয়ে বড় সাফল্য সূচিত হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ভবন’ এর আনুষ্ঠানিক যাত্রায়। আমাদের চারদিকে ভারত। সেখানে আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সবকিছুর এক কেন্দ্র, দেশভূমির বাইরে চেতনার শক্তির এক বড় ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।

২০১৬ সালে যখন বাংলাদেশ ভবনের কেবল কাজ শুরু হয়েছে তখন কথা বলার সুযোগ হয়েছিল বিশ্বভারতীর এখনকার উপাচার্য প্রফেসর ড. সবুজকলি সেন এর সঙ্গে। তিনিই নিজমুখে দিয়েছিলেন সুখবরটি। সেসঙ্গে বিশ্বভারতী প্রাঙ্গনে বর্ণাঢ্য আনুষ্ঠানিকতায় একদিন ‘বাংলাদেশ ভবন’ এর উদ্বোধনের কথা জানিয়েছিলেন। তখন প্রখর রোদে ইট বালু সিমেন্ট রড আর একদল মিস্ত্রির কর্মকাণ্ড দেখেও অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে মন ভরে উঠেছিল। বিশ্বভারতীতে ‘বাংলাদেশের এক টুকরো ছায়া’ তৈরির সেই আয়োজন সুসম্পন্ন হয়েছে। সফল হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন। তিনি নিজ হাতে উদ্বোধন করে এসেছেন শান্তিনিকেতনে এক টুকরো ‘বাংলাদেশ’।

সাংবাদিক ও লেখক বন্ধুদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৬,০০০ বর্গফুট জায়গার অত্যাধুনিক দোতলা বাংলাদেশ ভবন এ আছে একটি মিলনায়তন, জাদুঘর এবং গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারের জন্য বাংলাদেশ থেকে নেয়া হয়েছে প্রায় ৩৫০০ বই। এর মধ্যে অনেক বইই রবীন্দ্রচর্চা এবং রবীন্দ্র গবেষণা ভিত্তিক, যা ভারতে সহজলভ্য নয়। গ্রন্থাগার আর জাদুঘরটিতে রয়েছে অনেকগুলি ইন্টার অ্যাকটিভ, টাচ স্ক্রিন কিয়স্ক। রয়েছে রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা শোনার জন্য অডিও কিয়স্ক। ছাপানো বই ছাড়াও ডিজিটাল বইও পড়তে পারবেন পাঠকরা। জাদুঘরটিকে মূলত ৪টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। শুরু হয়েছে উয়ারি বটেশ্বরে প্রাপ্ত ২৫০০ হাজার বছর পুরনো সভ্যতার নিদর্শন দিয়ে। শেষ হয়েছে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে। মাঝের অনেকটা সময় জুড়ে এসেছে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যেমন রয়েছে, তেমনই আছে অতি দুর্লভ কিছু ছবি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত নানা প্রত্ন নিদর্শনের অনুকৃতি। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলির মধ্যে উয়ারি বটেশ্বরে প্রাপ্ত প্রত্ন নিদর্শন যেমন আছে, তেমনই আছে ৬ষ্ঠ-৭ম শতকের পোড়ামাটির কাজ, ১৬শ শতকের নক্সাখচিত ইট প্রভৃতি। রয়েছে পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়ের নানা নিদর্শন, দেবদেবীদের মূর্তি। কোনটা পোড়ামাটির, কোনটি ধাতব।

মাঝখানে সুলতানি এবং ব্রিটিশ শাসনামলও এসেছে জাদুঘরটিতে রাখা নানা প্যানেলে।

রয়েছে ঢাকার জাতীয় জাদুঘর থেকে আনা বেশ কিছু মুদ্রা। এই পর্যায়টি শেষ হয়েছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ে। তারপরের বিভাগ শুরু হয়েছে ৫২-র ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক যে বিভাগ, তার আগে ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গটি এ কারণে রাখা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সূচনা তো সেই ৫২-তেই। নানা প্যানেলে আর ছবিতে ধরা রয়েছে ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি সকালে পাকিস্তানী সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যে ঐতিহাসিক মিছিল হয়েছিল, সেখানে গুলি চালনা আর ভাষা শহীদদের প্রসঙ্গ। তারপরে ৬২র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬-র আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা— এসব পেরিয়ে ৭০ এর নির্বাচন প্রসঙ্গ রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রয়েছে একটি আলাদা গ্যালারি। তাতে যুদ্ধের সময়কার নানা দুর্লভ ছবি, শরণার্থী শিবির এগুলি। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে রয়েছে সম্পূর্ণ পৃথক একটি বিভাগ। পূর্ববঙ্গে সাজাদপুর, শিলাইদহ, পতিসরের কাছারী বাড়ির ছবি, সেখানে কবির ব্যবহৃত নানা জিনিষের অনুকৃতি দিয়ে সাজানো রয়েছে জাদুঘরের এই অংশটি। কয়েকটি ব্যবহৃত বস্তুও আনা হয়েছে সাজাদপুর থেকে– কেরোসিনের বাতি, লবণ দানি, খাবার পাত্র। যেসব প্রত্ন নিদর্শন নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেগুলি দীর্ঘমেয়াদী ঋণ হিসাবে বিশ্বভারতীতে এসেছে। বেশ অনেক বছর থাকবে। চিরস্থায়ীভাবে দেয়া হয় নি। সরকারের সঙ্গে বিশ্বভারতীর মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী নিদর্শনগুলি এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বভারতীতে ‘বাংলাদেশ ভবন’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, ’শান্তিনিকেতন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে গড়া এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান আমাদের যেমন মাতৃভাষা বাংলা চর্চার সুযোগ করে দেয়, তেমনি বিশ্বসাহিত্যকে জানার দুয়ার খুলে দেয়। আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গেই তিনি জড়িয়ে আছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধন হতে চলেছে, এটা কত যে আনন্দের এবং গৌরবের, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। শান্তিনিকেতনে এই ভবন স্থাপনের সুযোগ প্রদানের জন্য আমি বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার, ভারত সরকার এবং সর্বোপরি ভারতের বন্ধুপ্রতিম জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমি আনন্দিত এ জন্য যে, ভবনটি প্রতিষ্ঠায় যৎসামান্য হলেও আমার সম্পৃক্ততা থাকল।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘পারিপার্শ্বিকতা আমাদের আলাদা করে রাখলেও বাঙালিরা মনেপ্রাণে এক এবং অভিন্ন। অনেক সময় ক্ষুদ্রস্বার্থ আমাদের মনের মধ্যে দেওয়াল তৈরি করে। আমরা ভুল পথে পরিচালিত হই। এই দেওয়াল ভাঙতে হবে। মনের ভিতর অন্ধকার দানা বাঁধতে দেওয়া যাবে না। ক্ষুদ্র দ্বন্দ্ব-স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারলেই কেবল বৃহত্তর অর্জন সম্ভব। কবিগুরু বলেছেন: নিশিদিন ভরসা রাখিস, ওরে মন, হবেই হবে।/ যদি পণ করে থাকিস, সে পণ তোমার রবেই রবে।/ ওরে মন হবেই হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অনেকের কাছেই তৃষ্ণার্তের মতো পানির অপেক্ষা। এই তৃষ্ণা যতটা না নদী পানির ন্যায্য হিস্যা আদ‍ায়ের শর্ত, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক স্ট্যান্ট। কিন্তু আমাদের জীবনপ্রবাহও যে অভিন্ন নদীর মতো বাঙালির নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতির সূর বিরাজিত সেই কথা আমরা একবারও ভেবে দেখবার সময় পাই না। আমাদের কাছেও বিশাল জলসম্ভার জমা হয়ে গেছে। যেটি আমাদের ভাষা সংস্কৃতি। বাঙালি হিসেবে ভাষা সংস্কৃতির ঐতিহ্য আর ঐদার্য টিকিয়ে রাখতে হলে পৃথিবীর যেকোনো জাতি গোষ্ঠির মানুষকে আমাদের কাছেই আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরের মধ্য দিয়ে সে দেশের চিন্তাশীল প্রতিটি বাঙালি তাদের জীবন তৃষ্ণায় নতুন স্বপ্ন বুনেছেন। টানা সপ্তাহজুড়ে গোটা ভারতে বইছে সেই আবহ।

আজই (২৮ মে ২০১৮) দেখছি আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়। শিরোনাম ‘একই বৃন্তে’। প্রকৃতঅর্থেই পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত নতুন এই যথবদ্ধতার ভেতর দিয়ে বাংলার এক দীর্ঘপ্রসারি কল্যাণের সম্ভাবনা দেখছে। ওই সম্পাদকীয় কলামের পুরো অংশের ভেতরই প্রবেশের যৌক্তিকতা থেকে যায়।

 ইতিহাসের সর্ববৃহৎ গুণ সম্ভবত ইহাই যে তাহা অতীতকে ছাপাইয়া ভবিষ্যৎ গড়িবার দিশা জোগায়। ভারত ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সামান্য জ্ঞানও বলিয়া দেয় যে, তাহাদের যৌথ ভবিষ্যৎ গড়া কেবল জরুরি নহে, তাহা গড়িবার পথটি বেশ সহজও বটে। যে কোনও দুইটি দেশের মৈত্রীর জন্য কঠিনতম ধাপ: পরস্পরের সংস্কৃতির সহিত পরিচিত হওয়া। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে সেই ধাপটি নূতন করিয়া তৈরির দরকার নাই। জন্মাবধি তাহারা নাড়ির টানে যুক্ত। দুই বাঙালির মধ্যে প্রবহমান ভাষা ও সংস্কৃতির সেই নাড়ির টানটিকে ব্যবহার করিয়া ভারত ও বাংলাদেশ সহজেই যৌথতার পরবর্তী ধাপগুলি গড়িয়া তুলিতে পারে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এতখানি সাযুজ্য থাকিতেও কেন ঢাকা ও দিল্লি/কলকাতার পারস্পরিক আদানপ্রদানের মঞ্চ আরও দৃঢ় হইল না? প্রশ্নের উত্তর: সরকারি ও বেসরকারি সমাজের মধ্যে আগ্রহের অভাব। নানা রকম মৌখিক অঙ্গীকার সত্ত্বেও আগ্রহের অভাবেই বার বার ভারত-বাংলাদেশ যৌথতার নানা প্রকল্পের বাস্তবায়ন কঠিন হইয়াছে। শান্তিনিকেতনের নূতন বাংলাদেশ ভবন কি সেই বাধা কাটাইয়া পারস্পরিকতার মঞ্চ হইয়া উঠিতে পারিবে? গত সপ্তাহান্তে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একত্র ভবন উদ্‌যাপন দেখিতে দেখিতে এই সব সংশয় গ্রাস করিতেছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তরফে যে আগ্রহ সত্যই আন্তরিক, তাঁহার বক্তব্যে তাহা পরিষ্কার। এক বিরাট বাংলাভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কথা তিনি অহঙ্কারের সহিত বলিয়াছেন, তাহাদের সাংস্কৃতিক ঐক্যের বিষয়ে তাঁহার কথায় প্রত্যয় স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। আক্ষেপের কথা, লজ্জারওপশ্চিমবঙ্গে এই প্রত্যয় তুলনায় অনেক বেশি দুষ্প্রাপ্য। দুই দেশে বাংলার প্রতি প্রত্যয়ের এই পার্থক্য ভাবাইয়া তুলিবার মতো। মাতৃভাষাকে যে মাতৃদুগ্ধের সহিত তুলনা করা হয়, তাহা তো এই জন্যই যে মাতৃভাষার প্রকৃত শিক্ষা জাতির জীবনে অপরাপর অর্জনকেও শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাইতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে হয়তো গোড়াতেই গলদ। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির সেই প্রকৃত শিক্ষা এ রাজ্যে হইতেছে কি না, কিংবা কত দূর হইতেছে, এই সব প্রশ্নের উত্তর কখনওই যথেষ্ট উৎসাহদায়ী নয়। সেই প্রকৃত শিক্ষা এখানে ডালপালা মেলিয়া বিস্তার পাইলে ভাষাগত টানেই বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ (তথা ভারত) নানা প্রয়াসে স্বাভাবিক ভাবে অংশী হইতে পারিত। দেখিবার বিষয়, এত দিন যাহা হয় নাই, এখন তাহা হয় কি না। নূতন ভবন কেবল অতীতের গৌরব-বিজ্ঞাপক সংগ্রহশালা হইয়া থাকে, না ভবিষ্যৎ গৌরবের ধাত্রীগৃহ হিসাবে পরিচিত হয়।

বাংলাদেশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ যে কী ভাবে নিজের ভাষা-সংস্কৃতির আঙিনায় পিছাইয়া আছে, তাহা বুঝিবার জন্য বাংলা শব্দ ও ভাষার চর্চার দিকে তাকানো যাইতে পারে। সীমান্তের পূর্ব পারে যে পরিমাণ উদ্যোগ, নিবেদন ও সঙ্গতির সহিত এই চর্চা ঘটে, পশ্চিম তাহার সহিত তাল রাখিতে পারে কোথায়! অথচ আজও যদি একত্র প্রয়াসে এই কাজগুলি করা সম্ভব হইত, বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিতে তাহা নূতন জোয়ার আনিতে পারিত। নূতন যে কোনও প্রচেষ্টায় যদি এই সব কাজ একটু হইলেও উদ্দীপনা লাভ করে, তাহাতে কেবল দুই বাংলা নহে, দুই দেশও বিরাট ভাবে উপকৃত হইবে।

একথা পশ্চিমবঙ্গের বড় বড় পণ্ডিতের মুখেই বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, বাংলা ভাষ‍া ও সংস্কৃতি সেখ‍ানে ভালো নেই। ভাষা হিসেবে বাংলা সেখানে কোনঠাসা হয়ে পড়ছে। ইংরেজি আর হিন্দির চাপে বাংলা ভাষার নদী সেখানে মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছে ‘বিশ্ব বাংলা’ শ্লোগানকে পরিচিত করে তোলার কাজ। এটি প্রকৃত অর্থে ব্র্যান্ডিং। কিন্তু ‍বাংলা ভাষা সংস্কৃতির অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়ে উঠলে ‘বিশ্ব বাংলা’ বাস্তবায়ন আবেগমথিত স্বপ্ন ছাড়া কিছুই থাকবে না। রবীন্দ্রভারতীর ‘বাংলাদেশ ভবন’ সেখানে এক টুকরো ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।

‘বাংলাদেশ ভবন’ নামক এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে অনেক বড় করে দেখার মতো স্বপ্ন রয়েছে। শুধু যাদুঘর বা শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়ে বাংলাদেশি হিসেবে ওই ভবনে দাঁড়ানোর প্রশান্তি নিলে এই বিশাল উদ্যোগ সার্থক হয় না। এর জন্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ’ বিভাগ খোলার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণের যথেষ্টই যৌক্তিকতা রয়েছে। বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধারণ ও রক্ষিত হচ্ছে বাংলাদেশে। আর ভারতের যেকোনো বাঙালিও যদি তার নিজস্ব জাতি সংস্কৃতির ইতিহাস গবেষণার প্রয়াস নেন তাহলে এই বাংলাদেশ ছাড়া তা অসম্ভব। এক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ ভবন’ গড়তে পারে সেই সেতুবন্ধন। এর মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন ও আদর্শকেও আমরা অনেক বড় করে মূল্যায়ণ করতে পারবো। একই সঙ্গে চিরতারুণ্যের প্রতীক বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টির ব্যাপ্তি নিয়েও অনেক বড় পরিসরে মূল্যায়ণের সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে। একইসঙ্গে বাংলা সংবাদপত্র, বাংলা সঙ্গীত, বাংলা চলচ্চিত্র, বাঙালি মানস, বাঙালির অগ্রগতি ও উন্নয়নের বিষয়গুলো নিয়ে বড় আঙ্গিকে ভাবনার ক্ষেত্রে কোনো বাঁধ থাকবে না। শতভাগ সাহিত্যপ্রাণ ও সংস্কৃতির কল্যাণে নিবেদিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো বিষয় নিয়ে ভেবে থাকবেন।